আমরা কিভাবে কোয়ারান্টাইনকে গঠনমুখী করতে পারি?

আমরা কিভাবে কোয়ারান্টাইনকে গঠনমুখী করতে পারি?

0

আমরা কিভাবে কোয়ারান্টাইনকে গঠনমুখী করতে পারি

আমরা কিভাবে কোয়ারান্টাইনকে গঠনমুখী করতে পারি? জীবনে হয়তো বা কোন মানুষ কল্পনাও করেনি যে মাসের পর মাস কোন স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি অফিস সব কিছু বন্ধ থাকবে। এই সময়ে দিনভর অনলাইনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোখ রাখলে আতঙ্কিত হওয়াটা স্বাভাবিক। করোনাভাইরাস নিয়ে ভয়াবহ সব খবর, হাজারো মানুষের মৃত্যুসংবাদ, সঙ্গে নানা গুজব তো আছেই। অথচ আতঙ্কিত না হয়ে, ঘরে বসে এই সময়টা কিন্তু আমরা কাজে লাগাতে পারি।

বছরজুড়ে সময় না পাওয়ার আক্ষেপ আমরা সবাই করি। নতুন কিছু শেখা, নিজের কিছু দক্ষতা গড়ে তোলা, কিংবা পরিবারের জন্য কিছু করা—সবক্ষেত্রেই আমাদের সময় হয় না। এখন একটা লম্বা সময় তো পাওয়া গেল। সব স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি। নিজেকে ও অন্যকে নিরাপদে রাখতে আমরা বাসায় থাকছি। শিক্ষার্থী বা তরুণেরা এই সময়টা কীভাবে কাজে লাগাতে পারেন, সেটাই বলার চেষ্টা করব।
অনলাইনে খোঁজখবর

আপনি হয়তো ভিনদেশি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে চান। কিংবা কোনো নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে পড়ালেখার নানা সুযোগ সম্পর্কে জানতে চান। কুইজ-অ্যাসাইনমেন্ট-পরীক্ষার চাপে সেগুলো আর করা হয়ে ওঠে না। আজ না, কাল করে করে দিন গড়ায়। এখন ঘরে বসে নিজের লক্ষ্যের দিকে এগোনোর পথগুলো সম্পর্কে খোঁজ করতে পারেন। যেমন বিভিন্ন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করার জন্য কী ধরনের নথিপত্র লাগে, প্রাথমিক যোগ্যতা কী কী, খরচ কেমন হয়—এসব তথ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট ঘেঁটে জেনে নিতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিষয়ভিত্তিক র‍্যাংকিং থাকে। কোন বিষয়ের জন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয় ভালো, জানার চেষ্টা করুন। আবার আপনি যদি নির্দিষ্ট কোনো পেশায় যুক্ত হতে চান, বা নিজের কোনো স্টার্টআপ চালু করতে চান, সেটা সম্পর্কেও ঘরে বসে ‘রিসার্চ’ শুরু করতে পারেন।

এই সময়ে বিশ্বের অধিকাংশ গবেষক-পেশাজীবী-শিক্ষকই ঘরে বসে অনলাইনে কাজ করছেন, অর্থাৎ মোটামুটি সবাই অনলাইনে সক্রিয় আছেন—এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন। ধরা যাক, আপনি পদার্থবিজ্ঞানের কোনো একটা বিষয় নিয়ে গবেষণা করতে চান, আপনার আগ্রহের কথা জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) একজন অধ্যাপককেই ই-মেইল করে ফেলুন না! কিংবা ধরা যাক, আপনার মহাকাশ গবেষণায় আগ্রহ। লিংকড–ইনে খুঁজে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার কোনো গবেষকের ই–মেইল ঠিকানা জোগাড় করুন, তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করুন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অধ্যাপক বা গবেষকেরা আগ্রহ নিয়ে ই–মেইলের জবাব দেন। আর যদি জবাব না-ও পান, তবু আপনার যোগাযোগ দক্ষতার একটা চর্চা তো হলো।

কোয়ারান্টাইনে বই পড়া

বইয়ের তাকে ধুলো পড়ে যাওয়া বইগুলো আবার ঝেড়ে-মুছে হাতে নিতে পারেন এ সময়। অনেক বই হয়তো পড়া হয়নি, জমা পড়ে আছে। কিংবা পড়া বইটাই তো আরও একবার পড়া যায়। তা ছাড়া বিনা মূল্যে বই পড়ার জন্য বেশ কয়েকটি মোবাইল অ্যাপ আছে। এগুলো ব্যবহার করে হাজার হাজার বই থেকে পছন্দের বইটি খুঁজে নিতে পারেন। যেমন নুক, গুগল প্লে বুকস, ওয়াটপ্যাড, গুডরিডস, আইবুকস ইত্যাদি। বাংলা বই পড়ারও কিছু অ্যাপ রয়েছে, সেগুলো নামিয়ে নিতে পারেন। আর যাঁরা বই লেখার কথা ভাবছিলেন, দেরি কেন? আজ থেকেই শুরু করে দিন।

দক্ষতা অর্জন

একবিংশ শতাব্দীকে বলা হয় সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক কাল। আর এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন নানা দক্ষতা। শেখার তো কোনো শেষ নেই, বয়সও নেই। তাই এই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে, নানাভাবে নতুন নতুন দক্ষতা অর্জন করতে পারেন। অনলাইনে বিষয়ভিত্তিক কোর্স শুরু করা যায়। অধিকাংশ কোর্সই বিনা মূল্যে করা সম্ভব। হার্ভার্ড, কর্নেল, কেমব্রিজ, অক্সফোর্ডসহ প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা অনলাইনে ক্লাস নেন। কোরসেরা, ইউডেমি, ইউডাসিটি, খান একাডেমি এদের মধ্যে অন্যতম। আর বাংলাদেশে রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের ই-লার্নিং ওয়েবসাইট muktopaath.gov.bd, নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ ও একবিংশ শতাব্দীর দক্ষতা অর্জনের জন্য x.bylc.org। স্কুল-কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাস করতে 10minuteschool.com ব্যবহার করতে পারো।

গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডিজাইন, প্রোগ্রামিং, ক্যালিগ্রাফি, কোডিং, বিট বক্সিং, ইয়োগা, রেসিপি, পেশাগত ই–মেইল, পাবলিক স্পিকিংসহ পছন্দের বিষয়গুলো শিখতে ইউটিউব ভিডিও দেখতে পারেন।

নতুন ভাষা শেখা

নানা ভাষা জানাটাও বড় একটি গুণ। কারও একাধিক ভাষা জানা থাকলে তাঁর বিদেশ ভ্রমণে অহেতুক ভীতি থাকে না। সহজে বন্ধুত্বও করা যায়। তা ছাড়া একাধিক ভাষা জানা থাকলে তাঁর কাজের পরিধি অনেক বেড়ে যায়। করোনাভাইরাসের এই কঠিন সময়টাতেই কিন্তু আমরা নতুন করে জানলাম, দেশের সীমানা আসলে খুব বড় কিছু নয়। বড় বড় দুর্যোগে সারা বিশ্বকেই এক হয়ে কাজ করতে হয়। এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের সংযোগ তৈরি করতে তাই ভাষা জানাটা খুব জরুরি।

ভাষা শেখার জন্য অনেক অ্যাপ রয়েছে, যেগুলোতে বিনা মূল্যে ভাষা চর্চা করা যায়। এর মধ্যে অন্যতম ডুয়োলিংগো (Duolingo)। আমি অবশ্য ব্যবহার করছি মেমরাইজ (Memrise) অ্যাপটি।

জীবনবৃত্তান্ত ঠিক করে নেওয়া

অনেকটা সময় চলে গেছে, কিন্তু জীবনবৃত্তান্ত বা সিভি, রিজুমে হালনাগাদ করা হয়নি। এই সমস্যা যাঁদের, তাঁরা এখন সিভি বা রিজুমে ঠিকঠাক করে নিতে পারেন। পেশাগত ক্ষেত্রে লিংকড–ইন প্রোফাইল ডিজিটাল সিভি হিসেবে কাজ করে। আপনার যদি পেশাগত যোগাযোগের সাইট লিঙ্কড–ইনে প্রোফাইল না থাকে, তাহলে আজই তৈরি করে ফেলুন। আর যদি প্রোফাইল তৈরিই থাকে, আজ থেকে প্রোফাইলটি সাজিয়ে নিন, নিয়মিত হালনাগাদ করুন।

অনলাইনে স্বেচ্ছাসেবা বা শিক্ষকতা

স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা বাসায় আছে। টিউশনও বন্ধ, তাই অনেকের পড়াশোনায় ঘাটতি পড়ছে। ভিডিও বা অডিও কলের মাধ্যমে নিজেদের গ্রামে বা প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক ক্লাস নিতে পারেন। এতে করে তারা উপকৃত হবে। এ ছাড়া জাতিসংঘের অনলাইন স্বেচ্ছাসেবা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। এই অভিজ্ঞতা আপনাকে এগিয়ে রাখবে।

অনলাইনে প্রতিযোগিতা বা সম্মেলন

শিক্ষাজীবনে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণে শিক্ষার্থীরা খুব আগ্রহী। ডিজিটাল রূপান্তরের সুবাদে এখন অনলাইনে রচনা প্রতিযোগিতা, স্টার্টআপ প্রতিযোগিতা বা তরুণদের সম্মেলন আয়োজন করা হয়। এই সুযোগগুলো কাজে লাগিয়ে অংশগ্রহণ করতে পারেন। সারা বিশ্বে আপনার জন্য ছড়িয়ে থাকা নানা সুযোগের তথ্য জানতে পারেন ইয়ুথ অপরচুনিটিজের মোবাইল অ্যাপ বা youthop.com এ।

অনলাইন শিক্ষানবিশি (ইন্টার্নশিপ)

হংকংয়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেওয়ার পর সে দেশের শিক্ষার্থীরা তাদের অবসর সময় কাজে লাগানোর জন্য অনলাইনে ইন্টার্নশিপ করতে বিশ্বের নানা প্রতিষ্ঠানে ই–মেইল করে। কারণ, কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য তারা ইন্টার্নশিপকে অপরিহার্য একটি বিষয় বলে মনে করে। আপনারাও এই সময়ে অনলাইনে ইন্টার্নশিপ করতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আগ্রহ প্রকাশ করতে পারেন। হতে পারে সেটি পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কিংবা বিনা পারিশ্রমিকে। অভিজ্ঞতাই এ ক্ষেত্রে বড় অর্জন। তা ছাড়া এই দুর্যোগের সময়ে ঘরে বসেই আপনি কাজ করতে চাচ্ছেন, আপনার এই মানসিকতা নিশ্চয়ই প্রতিষ্ঠানগুলো পছন্দ করবে। ভবিষ্যতে আপনি হয়তো পাকাপাকিভাবে সেই প্রতিষ্ঠানের কর্মী হয়ে যেতে পারেন।

ফিটনেস ধরে রাখার প্রচেষ্টা

‘কালই জিমে ভর্তি হচ্ছি’ অথবা ‘আগামী সপ্তাহ থেকেই ব্যায়াম শুরু করব’—এমন কথা অনেককেই বলতে শুনি। কিন্তু দেখা যায়, শুরু আর করা হয় না। এখন কিন্তু ঘরকেই ব্যায়ামাগার বানিয়ে নেওয়া যায়। ভারী যন্ত্রপাতি যে লাগবেই, তা কিন্তু নয়। খালি হাতেই বেশ কার্যকর শরীরচর্চা করা যায়। ইউটিউবে শরীরচর্চার অসংখ্য টিউটরিয়াল পেয়ে যাবেন।
মোটকথা সময়কে কাজে লাগাতে শিখুন। এই সময় বার বার জীবনে আসে না। জন্ম মৃত্যু খোদার হাতে তাই বলে হাতের উপর হাত রেখে বসে থাকাটা মোটেও ভালো কিছু নয়। আজকের কাজে লাগানো সময়টাই আপনার সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে । তাই আসুন আমরা কোয়ারান্টাইনের এই সময় গুলোকে নিজেদের গঠনমুখী কাজে ব্যাবহার করি যাতে সব কিছু খুলে গেলে আপনি অন্যদের চেয়ে সকল ক্ষেত্রে আগায় থাকেন।

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More